মরহুম অধ্যাপক আব্দুর রব মিঞা’র স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত

রহুম অধ্যাপক আব্দুর রব মিঞা’র স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত

মো: আব্দুর রব মিঞা ১৯৪৬ সনের ২৯ শে ডিসেম্বর পাংশা থানার অন্তর্গত রামকোল বাহাদুরপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম শফিউদ্দীন মিঞা ও মাতা সখিনা খাতুন। পিতামহ মরহুম চান মিঞা ও মাতামহ মরহুম মানিক মিঞা। মাতামহ সে সময়ে একজন সমাজপতি ও প্রচুর ভূ-সম্পদের অধিকারী ছিলেন। আঃ রব মিঞার পিতা প্রথমে ধর্মীয় ও পরে সাধারণ (এন্ট্রান্স) শিক্ষাগ্রহণ শেষে তৎকালীন ব্রিটিশ রেল বিভাগে চাকুরি করেন। তার কর্মস্থল ছিল বর্তমান সৈয়দপুরে। কিন্ত মাতার একমাত্র ছেলে হওয়ায় এবং দীর্ঘকালব্যাপী চোখের আড়ালে থাকতে হতো বিধায় মায়ের আদেশে চাকুরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন এবং পারিবারিক সম্পত্তি দেখাশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত হন। তিনি ৬৫ বছরব্যাপী গ্রামের মসজিদে ইমামতি করেন। তিনি ন্যায়নিষ্ঠ ও সাধারণ জীবন যাপন করতেন। খোদাভীরু, পরহেজগার মৌলভী হিসেবে সবাই তাকে শ্রদ্ধা এবং সম্মান করত।
আব্দুর রব মিঞা শিশু বয়সে পিতার কাছে আরবী, ফার্সি ও ঊর্দু ভাষা শিখেন এবং পরবর্তীতে মাছপাড়া উচ্চবিদ্যালয় হতে ১৯৬৩ সনে ম্যাট্রিকুলেশন, রাজবাড়ী কলেজ থেকে ১৯৬৫ সনে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৬৭ সনে কুষ্টিয়া কলেজ থেকে ¯œাতক ডিগ্রী কৃতিত্বের সাথে অর্জন করেন। ১৯৬৯ সনে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় হতে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৬৯ সনের একেবারে শেষ দিকে তিনি শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজে শিক্ষকতা পেশার মাধ্যমে কর্মময় জীবন শুরু করেন।
আব্দুর রব মিঞা ছোট বেলা থেকেই যেমন মেধাবী ছিলেন তেমনি খেলাধুলাতেও ছিল তার প্রবল আগ্রহ ও সুনাম। সকল প্রকার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তার পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মত। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজেকে বহুক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। আবার বিভিন্ন প্রকার সামাজিক কর্মকা-ে তার অবদান রেখেছেন অকাতরে। স্কুলের সকল প্রকার সাংস্কৃতিক কর্মকা- হতো তার তত্বাবধানে। তিনিই ছিলেন মধ্যমণি আবার অংশগ্রহণেও থাকতো তার কৃতিত্ব। স্কুল জীবন থেকে কর্মজীবন প্রবেশ পর্যন্ত বহু নাটক/যাত্রাপালা মঞ্চায়নের আয়োজনসহ মূখ্য চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেছেন। তৎকালে “সত্যাশ্রয়ী” নামক যাত্রাপালা সফল মঞ্চস্থ ও অভিনয়ের প্রশংসায় পালাটি পরপর তিনবার মঞ্চস্থ করতে হয়েছিল দর্শকের চাহিদা ও দাবীর কারণে।
সে পালায় তিনি নায়ক এবং তার বন্ধু অনুকুল চন্দ্র বীশ^াস, পুরুষ হযে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যা এখনো অনেকের মুখে আলোচিত হয়।
ফুটবল ও ভলিবল খেলায় ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা। মাছপাড়া এলাকাটি তখন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিল। প্রতিবছর ফুটবল টুর্ণামেন্টের আয়োজন হতো আব্দুর রব মিঞার যোগ্য নেতৃত্বে। তৎকালে থানা ও এলাকা পর্যায়ের গঠিত টিমের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফুটবল টুর্ণামেন্ট আয়োজিত হতো। আব্দুর রব মিঞা তার এলাকার টিমের নেতৃত্ব দিতেন। ফুটবল খেলার জন্য তাকে অনেক সময় হায়ার করে নিয়ে যাওয়া হতো। সুদূর গাইবান্ধা জেলাতেও তাকে যেতে হয়েছে খেলতে। খেলার স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি অনেক মেডেল, ট্রফি ও নানাবিধ পুরস্কার প্রাপ্ত হয়েছেন। স্কুল জীবনেই মাছপাড়া এলাকায় সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিক্ষা/বিনোদন ও খেলাধুলা কর্মকা- পরিচালনার নিমিত্ত একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠার চিন্তা করতেন। সে থেকেই মাছপাড়াতে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ক্লাব প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় কিছু ব্যক্তির প্রবল বাধা ও চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে স্থানীয় ছাত্র ও যুবকদের সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করেন “মাছপাড়া যুব সংঘ”। তিনিই প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এই ক্লাব পরবর্তীতে খেলাধুলা, সামাজিক, বিনোদন ও ধর্মীয় কর্মকা-ে প্রভূত সুনাম অর্জন করে চলেছে। তিনি ছিলেন সুন্দর আবৃতিকার এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালক।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন স্বৈরাচারী আইয়ুববিরোধী ও গণঅভ্যুত্থ্যান আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহন করেন। যে মিছিলে পাকবাহিনীর গুলিতে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ শামসুজ্জোহা নিহত হন সেই মিছিলের তিনি অগ্রভাগে ছিলেন এবং খুব কাছ থেকে তা প্রত্যক্ষ করেন। সে ঘটনায় তিনি ছিলেন খুবই ব্যথাতুর। যা তার ভিতরে এক গভীর বেদনার সৃষ্টি করে। তিনি মাছপাড়াতে ফিরে আসেন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন ও ৭০ এর নির্বাচনে জনমত গঠনে ব্যপক ভূমিকা রাখেন। তিনি তৎকালীন আওয়ামীলীগের থানা পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ৭১ এর উত্তাল মার্চে অনেক কষ্টে তিনি গ্রামে ফিরে আসেন এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রস্তুতির কার্যক্রম গ্রহণ করেন। রাজবাড়ী মহকুমা সদরে প্রথম যেদিন পাক হানাদার বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে, পরবর্তী রাতেই পাকবাহিনী রামকোল বাহাদুরপুর গ্রাম, মাছপাড়া নিঃশব্দে ঘিরে রাখে। ভোড়ের আজানের পরই তারা অপারেশন শুরু করে। গুলির শব্দ শুনার সাথে সাথেই আঃ রব মিঞা ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ীর পিছন দিক দিয়ে মাঠের মধ্যদিয়ে আঁকাবাঁকাভাবে দৌড় দেন। দীর্ঘ ৩/৪ মাইল দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আর বাড়ী না ফিরে ৬/৭ দিন একনাগারে হেটে চাচাতো ভাই আওয়ামীলীগ নেতা খোঃ নুরুল ইসলামের সাথে সীমানা পেরিয়ে ভারতে চলে যান। ঐদিন পাকবাহিনী ৪/৫টি গ্রামের অসংখ্য বাড়ীঘর জ¦ালিযে দেয় এবং অসংখ্য মানুষ হত্যা করে।
ভারতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ ওবায়েদুর রহমানের সাথে থাকতেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও অর্পিত দায়িত্ব পালনে মোঃ ওবায়েদুর রহমান ও জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী তাকে ¯েœহ ও পছন্দ করতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি তার কর্মস্তলে যোগদান করেন।
পরবর্তীতে শিক্ষকদের দুর্দশা লাঘবের জন্য অধ্যক্ষ একেএম শহীদুল্যার নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। সেই সাথে কলেজ শিক্ষক সমিতির ঢাকা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজের উন্নতির জন্য তিনি তার জীবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেন। তার কঠোর পরিশ্রম এবং ঐকান্তিক চেষ্টায় একটি পরিত্যাক্ত রেডিও ভবনের ছোট দোতলা ঘর থেকে কলেজ আজ তিনটি বিশাল অট্টালিকায় রূপান্তরিত হয়েছে। কলেজ থেকে বিশ^বিদ্যালয় কলেজে পরিবর্তিত এবং অনার্স সহ মাস্টার্স পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
ঢাকাস্থ পাংশা উপজেলা সমিতি এবং রাজবাড়ী জেলা সমিতি গঠনের একেবারে শুরু থেকে আব্দুর রব মিঞা জড়িত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সংগঠকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি সবসময় ঢাকায় পাংশা উপজেলা সমিতির একটি স্থায়ী কার্যালয় স্থাপনের স্বপ্ন দেখতেন এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর চেষ্টা করে গেছেন। সমিতিদ্বয়ের সকল কার্যনির্বাহী সংসদে তিনি কখনো যুগ্ম সম্পাদক অথবা সহসভাপতির দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। তিনি ষ্পষ্টবাদী ছিলেন। সত্য ও ন্যায় কথা বলতে কখনো পিছপা হতেন না। পাংশা উপজেলাও রাজবাড়ী জেলা সমিতি আয়োজিত সকল কর্মকা- যেমন চক্ষুশিবির, ত্রাণবিতরণও ছাত্র বৃত্তি প্রদান সহ সকল কর্মকা-ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে তিনি এলাকায় গরিব দুঃখী অসহায় মানুষের মাঝে সাধ্যমত সাহায্য ও সহযোগিতা করতেন। অনেক অসুস্থ মানুষকে ঢাকায় এনে নিজ খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। গরিব ছাত্রদের সহায়তা করেছেন। অনেকের চাকুরী ও কর্মসংন্তানের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি মাছপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রাক্তন ছাত্র সমিতির সভাপতি ছিলেন।
তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন। রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় তিনি দু’বার পবিত্র হজ¦ব্রত পালন করেন। তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল প্রতিষ্ঠায় সাধ্যমত দান করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে অনেক সুযোগ থাকা সত্বেও লোভলালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ২০১২ সালে তার শরীরে দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাধে। মহান রাব্বুল আলামীনের রহমতে সিংগাপুরে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এবং অসম্ভব মনোবল থাকায় রোগকে জয় করেন ।
শেষদিকে আবার কিডনি রোগে আক্রান্ত হন। সেক্ষেত্রেও তিনি ভেঙ্গে পড়েননি। তিনি পারিবারিক বন্ধন দৃঢ়ভাবে আগলে রেখেছিলেন। পিতার অবর্তমানে ছোটভাইদের কে নিয়ে একান্নবর্তী সংসার সাজিয়েছেন, যা এখনো চলমান। অবশেষে ২০১৮ সনের ৬ই সেপ্টেম্বর রাত্র ১০ ঘটিকায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন ( ইন্না… … রাজেউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তিনি বৃদ্ধ মা, দুই পুত্র, দুই পুত্রবধু, এক নাতনী ও চার ভাই রেখে যান। তার স্ত্রী জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সহকারী মহাব্যাবস্থাপক পদে চাকুরিরত ছিলেন। বড় ছেলে ডাচ্ বাংলা ব্যাংকে এফএভিপি পদে ও ছোট ছেলে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা পদে কর্মরত আছেন। তার ছোট ভাই বাংলাদেশ ব্যাংকে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে কর্মরত ছিলেন। অন্য ভাই ও ভাইএর স্ত্রীগণ শিক্ষকতা ও অন্যান্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত।
জনাব আব্দুর রব মিঞার কর্মবহুল জীবন, কর্মকা- স্বল্প সময়ে অল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তার মৃত্যুতে পাংশা উপজেলা ও রাজবাড়ী জেলাবাসী এক কৃতি সন্তানকে হারিয়েছে। তার প্রয়াণ সংবাদ শুনামাত্রই ঢাকাস্থ রাজবাড়ী, পাংশা ও মাছপাড়াবাসী ছুটে আসেন। ঢাকা এবং গ্রামের বাড়ীতে তিন দফা জানাযায় প্রচুর লোকের সমাগম হয়। সবশেষে তার ইচ্ছানুযায়ী গ্রামে পিতার কবরের পাশে দাফন করা হয়।
আসুন আমরা সবাই মরহুম আব্দুর রব মিঞার কৃতিত্বপূর্ণ জীবনকে অনুসরণ করি। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাৎবাসী করুন সবাই এই দোয়া করি। আমীন।